অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) ২০২৪-২৫: সংবিধান থেকে বাস্তবায়ন, উত্তরাখণ্ড মডেল ও পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা
প্রকাশের তারিখ: জুন ৪, ২০২৬ | লেখক: আইন ও নীতি বিশ্লেষক
ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ নং অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “অভিন্ন দেওয়ানি বিধি” (Uniform Civil Code – UCC) বর্তমান ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলির মধ্যে একটি। উত্তরাখণ্ড রাজ্য ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের প্রথম UCC বিল পাস করার পর থেকে এই আলোচনা আরও বেগবান হয়েছে। কিন্তু এই UCC আসলে কী? কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? এটি কি সত্যিই ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে? আর পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের মানুষের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে? এই সব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের বিস্তারিত আলোচনা।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) আসলে কী?
সহজ ভাষায়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হল এমন একটি আইনি কাঠামো যেখানে ভারতের প্রতিটি নাগরিকের জন্য—তা সে হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, খ্রিস্টান হোক বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী হোক—বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং ভরণপোষণ সংক্রান্ত একটি অভিন্ন আইন প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে ভারত বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের জন্য পৃথক পৃথক ব্যক্তিগত আইন (Personal Laws) অনুসরণ করে। যেমন হিন্দু আইন, মুসলিম আইন, খ্রিস্টান আইন। UCC চায় এই বৈচিত্র্যের অবসান ঘটিয়ে “এক দেশ, এক আইন” প্রতিষ্ঠা করতে।
সাংবিধানিক ভিত্তি: অনুচ্ছেদ ৪৪
ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশ, যা রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy) নামে পরিচিত, তার ৪৪ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে: “রাষ্ট্র সমগ্র ভারত ভূখণ্ডে নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) প্রণয়নের চেষ্টা করবে।” যদিও এই নির্দেশনাগুলি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়, তথাপি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এগুলিকে মৌলিক বলে গণ্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে (শাহ বানো বনাম উত্তরপ্রদেশ সরকার, স্মৃতি গুপ্ত বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া) বারবার UCC প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছে, একে জাতীয় একীকরণ ও লিঙ্গ সমতার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কেন প্রয়োজন? পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি
১. লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
বর্তমান ব্যক্তিগত আইনগুলিতে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে একজন পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ (Polygamy) বৈধ, কিন্তু হিন্দু আইনে তা নিষিদ্ধ। একইভাবে উত্তরাধিকারেও মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। UCC নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পূর্ণ আইনগত সমতা নিশ্চিত করবে, যা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম স্তম্ভ।
২. জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতা
ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত আইন প্রায়শই সাম্প্রদায়িক বিভেদের জন্ম দেয়। একটি অভিন্ন আইন ‘ভারতীয়’ হওয়ার পরিচয়কে মজবুত করে, ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত গৌণ পরিচয়ের ওপর জোর কমিয়ে দেয়। এটি “এক জাতি, এক আইন” ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়।
৩. আইনি জটিলতা ও দ্বন্দ্ব নিরসন
আন্তঃধর্মীয় বিবাহ (Inter-faith marriage) বা এমন পরিবার যেখানে সদস্যরা বিভিন্ন ধর্মের — তাদের জন্য সম্পত্তি বা সন্তানের অধিকার নিয়ে মামলা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। UCC এই জটিলতার অবসান ঘটিয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও অনুমানযোগ্য করবে।
৪. আধুনিক সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্য
অনেক ব্যক্তিগত আইন শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ ও রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বর্তমানে অচল বা অযৌক্তিক। UCC একটি যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ও সময়োপযোগী আইনি কাঠামো তৈরি করার সুযোগ দেয় যা আঠারো শতকের পরিবর্তে একবিংশ শতকের নাগরিকের চাহিদা পূরণ করবে।
৫. সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও ধর্মনিরপেক্ষতা
অনেকের ধারণা UCC সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাস্তবে এটি সঠিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠা করে। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাজ্য সকল ধর্ম থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখবে এবং সকল নাগরিকের জন্য এক আইন হবে। বিশেষাধিকার কাউকে দেওয়া হবে না।
উত্তরাখণ্ড মডেল: দেশের প্রথম ইউসিসি-র রূপরেখা
২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি উত্তরাখণ্ড রাজ্য বিধানসভায় ঐতিহাসিক ‘উত্তরাখণ্ড অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল, ২০২৪’ পাস করে। বর্তমানে এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায়। বিলটির কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে উল্লেখ করা হলো:
- বিবাহ ও সহাবস্থানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: লিভ-ইন রিলেশনশিপকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এই ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া লিভ-ইন বৈধ হবে না।
- বহুবিবাহের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: সকল ধর্মের জন্য একসঙ্গে একের অধিক স্ত্রী বা স্বামী রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি।
- বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের সমান বয়স এবং অধিকার: মেয়েদের জন্য বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ বছর (অন্যান্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে)। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই একই ভিত্তিতে আবেদনের অধিকার থাকবে।
- উত্তরাধিকারে সম্পূর্ণ সমতা: পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার পুত্রের সমান। তাছাড়া স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের উত্তরাধিকারী হবেন নির্দিষ্ট অংশে।
- সব ধর্মের জন্য অভিন্ন দত্তক বিধি: বর্তমানে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন দত্তক গ্রহণের স্বীকৃতি দেয় না (তবে কাফালা ব্যবস্থা আছে)। নতুন আইনে মুসলিম নাগরিকরাও এই অভিন্ন দত্তক আইনের আওতায় সন্তান দত্তক নিতে পারবেন।
- ভরণপোষণ (Alimony) নির্ধারণ: বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রী ও স্বামী উভয়ের জন্য ভরণপোষণের স্পষ্ট ও সমান নিয়ম তৈরি করা হয়েছে।
উত্তরাখণ্ডের এই মডেলটি আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যের জন্য একটি পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
গুজরাত ও অন্যান্য রাজ্যের অবস্থান
উত্তরাখণ্ডের পদক্ষেপের পর গুজরাত সরকারও একটি ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড কমিটি’ গঠন করেছে, যা জনগণের মতামত ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া প্রস্তুত করছে। মধ্যপ্রদেশ, আসাম এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলিও UCC বাস্তবায়নের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। রাজস্থান ও হিমাচল প্রদেশ সরকারি-বিরোধী দল থেকে এই দাবি উঠছে। এটা স্পষ্ট যে UCC আর কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিত: সম্ভাবনা ও আশঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে UCC বাস্তবায়নে সবচেয়ে সতর্ক ও সমালোচনামূলক অবস্থানে রয়েছে। রাজ্যের শাসক দলের তরফে বারবার বলা হয়েছে যে UCC প্রণয়নের আগে সর্বসম্প্রদায়িক ও সর্বদলীয় ঐকমত্য জরুরি। তাঁদের মূল যুক্তি হল, সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও ব্যক্তিগত আইনের অধিকারকে অগ্রাহ্য করে হঠাৎ করে এ ধরনের আইন চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কিন্তু কিছু বাস্তবতা উপেক্ষা করার নয়:
- পশ্চিমবঙ্গে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ ও যৌথ পরিবারে বসবাসের হার ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যক্তিগত আইনের জটিলতায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
- রাজ্যে নারীদের উত্তরাধিকার ও দত্তক নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা ও বৈষম্য বিদ্যমান। একটি অভিন্ন আইন এ ক্ষেত্রে নারীদের পক্ষে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
- রাজ্যের প্রচলিত আইনের সঙ্গে যদি কেন্দ্রীয় বা অন্য রাজ্যের UCC-র ব্যাপক পার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে আইনি দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে UCC বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারকে আরও বেশি সংবেদনশীলতা, গণশিক্ষা ও যথেষ্ট সময় নিতে হবে। সরাসরি জবরদস্তি পাল্টা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও বিরোধিতা: ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন
UCC-র সবচেয়ে বড় ও যৌক্তিক চ্যালেঞ্জ হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে এর সংঘাত। সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে নিজ ধর্ম প্রচার, পালন ও প্রসারের স্বাধীনতা দিয়েছে। অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘু নেতাদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত আইন তাদের ধর্মের অঙ্গ, তাই তাতে হস্তক্ষেপ করা হবে মানে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন।
এর জবাবে সমর্থকরা বলেন, ব্যক্তিগত আইন সবসময় ‘ধর্মের অপরিহার্য অংশ’ নয়; বরং সময় ও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী তা পরিবর্তনযোগ্য। তাছাড়া, নারী অধিকার ও সমতার প্রশ্নে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্বে আবদ্ধ।
ভবিষ্যৎ পরিক্রমা: জাতীয় UCC কীভাবে আসবে?
বর্তমানে UCC রাজ্যস্তরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু আদর্শ লক্ষ্য হলো একটি জাতীয় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। দেওয়ানি বিষয়গুলি সংবিধানের সমবর্তী তালিকার (Concurrent List) অধীনে পড়ায় কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই আইন প্রণয়ন করতে পারে। যদি কেন্দ্র সরকার একটি মডেল UCC বিল পাস করে, তবে রাজ্যগুলি তাদের নিজস্ব আইন সংশোধন করে বা সেই মডেল গ্রহণ করতে বাধ্য হবে না, কিন্তু আদালত ও জনমতের চাপে ধীরে ধীরে সব রাজ্যকেই সমন্বয় করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জাতীয় UCC আসতে আরও ৫-১০ বছর সময় লাগতে পারে।
উপসংহার: সময় কি এখনই পাকা?
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোনো নতুন চিন্তা নয়, স্বাধীনতার আন্দোলন থেকেই আলোচিত একটি বিষয়। উত্তরাখণ্ডের উদ্যোগ প্রমাণ করল, এটি সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে ‘কীভাবে’ প্রয়োগ করা হবে, সেটা ‘কী’ প্রয়োগ করা হবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্মীয় নেতাদের সংলাপে আনা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশঙ্কা দূর করা এবং লিঙ্গ সমতার জোরালো বার্তা দেওয়া—এই কয়েকটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েই UCC-কে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোকে এখন আর কেবল প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে গঠনমূলক ভূমিকা নিতে হবে। কারণ অভিন্ন আইনের মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মাঝে সমতা স্থাপন করা না হলে, বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। UCC সেই বিভেদ মোচনের এক যুগোপযোগী প্রয়াস, যার সফলতা নির্ভর করবে সংবেদনশীলতা ও যুক্তির মিশেলে।
আপনার কী মতামত? অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কি সত্যিই দেশের ঐক্য ও নারীস্বাধীনতা বাড়াবে, নাকি তা ধর্মীয় স্বাধীনতাকে খর্ব করবে? কমেন্টে জানান।
আরও তথ্যের জন্য: ভারতীয় সংবিধান, আইন কমিশনের ২৬৮তম প্রতিবেদন এবং উত্তরাখণ্ড UCC বিলের সম্পূর্ণ পাঠ দেখতে পারেন।
- Blog Articals
- Challenge Games
- Club
- Core Committee Updates
- General Member Updates
- Islamic Welfare Committee
- Judiciary Updates
- Latest
- Memory Games
- Popular
- Quiz Games
- Trending
- Uncategorized

